#৪ - জাতীয় সঙ্গীত, জিষ্ণুর অন্তর্ধান ও আম-কাসুন্দি

     OBS-এ চাকরি করে যাচ্ছিলাম মন দিয়েই। বাধ সাধলো কোনও অজ্ঞাত কারণে ভয়ানক রকমের চিন্তিত এক মা। সে কীভাবে যেন আমার ফোনের নম্বর জোগাড় করে ক্রমাগত আমাকে ফোন করে আমাদের কর্ণধারের নম্বর চাইতে থাকে। সে নাকি কেবল ওনার থেকেই সকল বই ও তাদের বিভিন্ন এডিশন সম্বন্ধে জানতে চায়। আমিও নানান আছিলায় কথা ঘোরাতে থাকি, কারণ এ কথা জলের মতো পরিস্কার হয়ে যায় যে তার মূল উপলক্ষ বই নয় মোটেও, সে আসলে যেনতেনপ্রকারেণ কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে ভাব জমাতে চায়।

     এরকমই এক দিন মহিলা ফোন করে কান ঝালাপালা করে দিচ্ছে; আমি ফোন কানে নিয়ে আপিসময় হেঁটে বেড়াতে বেড়াতে এই মহিলা কে বিরত করার নতুন ফন্দী-ফিকির আঁটছি, আর আমাদের আপিসের হেড সোনালি দি ওনার ঘরের মধ্যে থেকে আমার দিকে সন্দিহান দৃষ্টি হানছেন মাঝেমাঝে, এমন সময় দেখি কিনা আপিসের ভিতরে-বাইরে বেজায় ভিড় জড় হয়ে গেছে।

      থকথকে ভিড়। তিল ধারণের জায়গা নেই বল্লেও কম বলা হয়; মাইক্রোস্কোপের তলায় মাছি মারতে থাকা এমনি চোখে ধরা দেবে না এমন ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবাণুও ওই ভিড়ের মধ্যে প্রবেশ করার আগে অনেকবার ডন-বৈঠক দিতে দিতে ভাল-মন্দ বিচার করবে। এদিকে রিপাব্লিক বা ইন্ডিপেনডেন্স ডে-র কোনওটাই নয়, তবু ভিড় "জনগণমন" গাইতে ব্যস্ত। গেয়েই চলেছে। শেষ হয়ে গেলে আবার শুরু থেকে শুরু।

     গান শেষ করেও সকলেই ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। নড়ে না কেউই। না মানুষ, না গাড়ি। রাস্তা গিজগিজ। যে যেখানে সে সেখানেই দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে অশ্রাব্য ভাষায় গুজুর-গুজুর চালিয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে কোনওক্রমে বেড়িয়ে একটা ট্যাক্সিতে উঠে জিষ্ণুর স্কুলের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলাম। মনে ভারি চিন্তা সে ছোঁড়ার জন্যে। কিন্তু গাড়ি কিছুতেই নড়ে না। তাই অগত্যা এক গাড়ির ছাদ থেকে আরেক গাড়ির ছাদে লাফিয়ে লাফিয়ে এগোতে থাকলাম। এমনিতে খুব একটা অসুবিধে হচ্ছিল না, কেবল মোড় বাঁকতে গেলে তেড়ছা ভাবে দাঁড়ানো গাড়িগুলোর ছাদে ল্যান্ড করার জন্যে খুব খানিক জ্যামিতিক হিসেব কষে নিতে হচ্ছিল। প্রথম দিকে তাতে একটু বুক ঢিব-ঢিব করছিল বটে, কারণ আমি তো চিরকালই জ্যামিতি তে (নি)দারুণ, কিন্তু শেষমেশ গা সওয়া হয়ে গেল। বার তিনেকের বেশি আছাড়ও খাইনি, বা দুটো গাড়ির মধ্যে আটকেও যাইনি।

অবশেষে স্কুলে পৌঁছে দেখলাম সে মক্কেলের টিকির দেখা নেই। স্কুলের অন্যান্য ছাত্রছাত্রীরা যদিও সেই একইভাবে হয় জাতীয় সঙ্গীত গাইছে নইলে ঠায়ে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করছে। দেখে ভারি মন খারাপ হয়ে গেল।

সে বাঁদর কে পাওয়া গেল বাড়ির মধ্যে। খালি গায়ে মাঝখানের ঘরের মেঝেতে শুয়ে শুয়ে সে রিমোট হাতে টিভি-র চ্যানেল ঘোরাচ্ছিল। ওর পাশেই শুয়ে ছিল সাদা, বেশ পুরু লোমওলা এক পাহাড়ি কুকুর। আয়তনে মোটের উপর বেঁটে বল্লেই চলে। লোমেও হাল্কা ছাই রঙের চড়া পড়েছে এই পোড়া শহরে থাকতে থাকতে। ওদিকে ভিতরের ঘরের একটা টেবিলের তলা থেকে বিলবো আড় চোখে সব কিছু সাইজ করে নিচ্ছে।

এই রকম মনোরম দিন কাটাচ্ছে জিষ্ণু, আর ওদিকে আমি ওর জন্যে হত্যে দিয়ে হন্যে হয়ে গোটা দিন চষে বেড়িয়েছি ভাবতেই ভারি রাগ হোলো। ধরে এক ঘা কসিয়েই দিলাম ওর ঠ্যাঙে। ও কেবল চোখ গোল-গোল করে থ হয়ে তাকিয়ে থাকল প্রথমে, তারপর তামাকের ছোপ লাগা দাঁত বের করে, নিজের ভাঙ্গা চশমার ডাঁটি সামলে নিয়ে খানিক দাঁত কেলিয়ে নিয়ে জয়েন্ট বানাতে শুরু করল।

হঠাৎ বিশ্রী শব্দ করে বেজে উঠল জিষ্ণুর ফোন। আমি আবার সেই মহিলা কোনও কারসাজি করে ওর ফোন নম্বরটাও জোগাড় করে ফেলেছে ভেবে লেপের তলায় গা ঢাকা দিতে গেলাম। কিন্তু না। ক্যাম্পাস থেকে জিষ্ণুর কোনও এক বন্ধুর ফোন। ওদের কি না কি রিহার্সাল আছে। কথা বলতে বলতেই জিষ্ণু জিভ দিয়ে চেটে জয়েন্ট রোল করা সম্পন্ন করল। তারপর ফোন রেখে আমায় জিজ্ঞেস করল, "ক্যাম্পাসে যামু?"

আমি বল্লাম, "আবার সেই গাড়ির উপর লাফিয়ে লাফিয়ে?"

ও বল্ল, "না। নিতাই দারুণ রিকশা চালায়। ঠিক ফাঁক-ফোকর গলে বেড়িয়ে যাবে, দেখিস।"

নিতাই আমাদের দেখেই এক গাল হেঁসে ওর ডোরাকাটা লাল-নীল গামছা এ কাঁধ থেকে ও কাঁধে নিয়ে ফেললো। আমি রিকশা তে উঠে জিজ্ঞেস করলাম, "ভিড় নেই?"

নিতাই প্যাডেল করতে করতে অমায়িক হেঁসে জবাব দিল, "সেসব হুজুগ কেবল বড় রাস্তায় গো, দাদা। গলি-গালায় কিচ্ছুটি নেই।"

ক্যাম্পাস পৌঁছে জিষ্ণু গেল রিহার্সালে। আমি ঘাসের উপর ঠ্যাঙ ছড়িয়ে বসে ভাবছি কি করি, এমন সময় দেখি সর্বজয়া একটা উই-এর ঢিপির মধ্যে দু হাতের দুটো করে আঙ্গুল ঢুকিয়ে বসে আছে। আমায় দেখে বল্ল, "ভয় পাস না। একদম চুপটি করে বসে থাকলে তোকে আমি আম-কাসুন্দি খাওয়াবো।"

আমি আম-কাসুন্দির প্রতিশ্রুতি পেয়ে মনের সুখে ঘাসের উপর শরীর ফেলে দিয়ে শেষ দুপুরের রোদের ঝিকমিকের দিকে তাকিয়ে চোখ বন্ধ করলাম। 

Comments

Popular posts from this blog

#২ - কাফ্কা জানেন

#৩ - বলব কি ভাই, আজগুবি ছাই